ঢাকার নরম মাটি ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিসহ পাতাল রেলের যত চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড (পাতাল) মেট্রোরেল নির্মাণ হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি বাংলাদেশের প্রতিবেশি ভারতের বিভিন্ন শহরেও আছে পাতাল মেট্রোরেল। বাংলাদেশেও পাতাল মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক দিচ্ছেন যে এই কাজ সম্পন্ন করা এতো সহজ হবেনা। তাছাড়া নির্মাণ পরবর্তী নানা চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে।

ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত যাবে এই পাতাল রেল।

এমআরটি লাইন-১ হিসেবে চিহ্নিত এই প্রকল্পটি দুটি অংশ। একটি হলো বিমানবন্দর রুট আর আরেকটি পূর্বাচল রুট।

বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পুরো অংশ হবে ভূগর্ভে। এ অংশে থাকবে মোট ১২টি স্টেশন।

অন্য অংশ হবে এলিভেটেড। সেই অংশ নতুন বাজার থেকে কুড়িল হয়ে যাবে পূর্বাচলে। ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটারের এ অংশে থাকবে মোট নয়টি স্টেশন।

এই প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

তবে এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল’ প্রকল্প ঢাকা শহরের জন্য কতটা উপযোগী বা টেকসই হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

তাদের মতে অপরিকল্পিত ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ঢাকা ইতোমধ্যেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে।

যানজট, জলাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতার বিষয়টি তুলে আনছেন তারা।

‘ঢাকার মাটি নরম’

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে, পাতাল রেল মাটির কমবেশি ৩০ মিটার অর্থাৎ ৯০ ফুট নিচ দিয়ে যাবে। টানেল বোরিং মেশিন দিয়ে এর নির্মাণকাজ চালানো হবে।

তবে মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণকাজ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী আর্থ-সামাজিক-পরিকল্পনাগত বিবেচনায় পাতাল রেল প্রকল্প টেকসই কোনো প্রকল্প নয়।

পাশাপাশি তারা এটাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক’ বলেও উল্লেখ করছেন।

নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আন্ডারগ্রাউন্ড প্রজেক্টের কাজে কনস্ট্রাকশানের সময় ও তার পরবর্তীতে কার্যক্রম শুরু হবার পরও ঝুঁকিপূর্ণ।”

এর বড় কারণ হচ্ছে, যেসব এলাকার নিচ দিয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ করার হবে সেসব এলাকায় ভবনগুলো কতটা মানসম্মত সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

অধ্যাপক হক বলেন, ভবনগুলো নিয়ম মেনে করা হয়েছে কিনা সেটি খুব একটা তদারকি করা হয়নি। ঢাকার ভবনগুলো নিয়ম মেনে হচ্ছে কিনা সেটি দেখার দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের।

“রাজউক কনস্ট্রাকশানটা করতে পারে না এবং তারা দেখতেও পারে না বিল্ডিংটা কীভাবে করা হলো। বিশেষ করে থার্ড পার্টি যখন বিল্ডিংটা করে অনেক কিছু কম্প্রোমাইজ হয়ে যায়।”

কলকাতার আন্ডারগ্রাউন্ড নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে কলকাতাই প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো করে।

“তারা একবারই করেছে, ভোগান্তিটা দেখেছে। রাস্তায় ধসও দেখেছে। কোনোভাবে তারা করেছে অনেক উন্নয়ন যন্ত্রণা ও অনেক ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে। দ্বিতীয়বারে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে যায়নি।”

তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো কনস্ট্রাকশানের ঝুঁকিটা আরও একবার বিবেচনায় আনা উচিত বলে মনে করছেন মিঃ হক।

এরকম কাজে বাংলাদেশের পারদর্শিতা অনেক কম উল্লেখ করে তিনি বলেন “এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা অন্য বড় প্রকল্প যা আছে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা আমরা ঠিকমতো করতে পারি না। আর মাটির নীচে গর্ত করে আশেপাশের সম্পদগুলোকে ঝুঁকির মুখে নিয়ে আসবো – এখানে ভাইব্রেশনের যেই প্রভাবটা পড়বে সেটা আমরা কতটা ভেবেছি?

আমার মাটির যে রকম অবস্থা – আমাদের নরম মাটি। ভবনগুলো কোনটাই কিন্তু সেফটি কমপ্লায়েন্সে করে বানানো হয়নি-রাজউকেরই কিন্তু তথ্য।

সেখানে ঢাকার মতো অপরিকল্পিত ঘনবসতিপূর্ণ শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড কনস্ট্রাকশানের ঝুঁকিতো অবশ্যই আছে”- বিবিসিকে বলছিলেন অধ্যাপক শামসুল হক।

‘পর্যাপ্ত জায়গা নেই’

যানজট নিরসনে পাতাল রেল অন্যতম একটি সমাধান হলেও ঢাকার মতো শহরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পগুলোর কাজের সময় নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেছে এবং অতিরিক্ত অর্থও খরচ হয়েছে। এছাড়া মানুষের ভোগান্তি তো ছিলই।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স -এর সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলছেন – “গত কয়েক বছরে কনস্ট্রাকশান চলার সময় দেখেছি নানা ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বায়ু দূষণ হয়েছে, এক্সিডেন্ট হয়েছে মানুষ মারাও গিয়েছে। আবার এই এলাকায় যখন জলাবদ্ধতা হয় বাজে একটা অবস্থা তৈরি হয়”।

“এ ধরনের কনস্ট্রাকশান করার জন্য যে পরিমাণ খালি জায়গা থাকা দরকার, সে রকমটা থাকলে এসব প্রকল্পের কাজ সুন্দরভাবেই হয়তো করা যেত। কিন্তু ঢাকার মতো জনবহুল, কংক্রিটের শহরে ওই জায়গাটুকু নাই এ রকম প্রকল্প সফল বাস্তবায়ন করার জন্য।“

আর সে কারণে এর একটা ইমপ্যাক্ট জনজীবনে পড়বে যা এড়ানোর কোনও সুযোগ নাই বলে উল্লেখ করছেন তিনি।

“কনস্ট্রাকশান যতদিন চলবে ততদিন পরিবেশ দূষণ হবে, শব্দ দূষণ হবে, অ্যাক্সিডেন্ট হবে, যানজট জলজট হবে – এটা এড়ানোর কোনও আশু সমাধান দেখছি না”।

এছাড়া ঢাকার যে রাস্তাগুলোর উপর ভর করে পাতাল রেল হবে সেই রাস্তার ডিজাইনও পাতাল রেল তৈরির উপযোগী নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টানেল থেকে মাটি খনন করে বের করে এনে সেগুলো কোথায় ফেলা হবে , পরিবেশে তা বিরূপ প্রভাব ফেলবে কিনা, নতুন কোনও জায়গায় মাটি ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়াবে কিনা সেই প্রশ্নও রয়েছে।

কী বলছে কর্তৃপক্ষ?

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিকী বলছেন সবদিক যাচাই করে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

“যখন যেই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসবে সেগুলো মোকাবেলা করেই আমরা কাজগুলো করবো”।

মি. সিদ্দিকী বলেন, মাটির নিচ দিয়ে মেট্রোরেল ভূমিকম্প সহনীয় হবে কিনা সেটি যাচাই করা হয়েছে। তাছাড়া রুটগুলোর মাটিও পরীক্ষা করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগরীতে অতীতের ভূমিকম্পগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পেও টানেল এবং স্টেশনগুলোর কোন ক্ষতি হবে না।

“ঢাকা মহানগরীতে এ পর্যন্ত যে কয়টা ভূমিকম্প হয়েছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে ৭.৫ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প রেসিস্ট করতে পারবে এভাবেই আমরা এটা নির্মাণ করছি”- বলেন মিঃ সিদ্দিকী।

ঢাকার রাস্তাগুলো সব জায়গায় এক রকম নয়। কোথাও প্রশস্ততা বেশি, কোথাও আবার কম। এটাও বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

‘মেট্রোরেলের জন্য দুটি টিউব করা হবে, যাতে দুটি লাইনে নিরবচ্ছিন্নভাবে ট্রেন চলতে পারে। প্রশস্ত সড়কের নিচে দুটি টিউব সমান্তরালে রাখা যাবে।”

“মালিবাগ-রাজারবাগ অংশে দুটি টিউব পাশাপাশি রাখার মতো জায়গা নেই। এ কারণে সেখানে একটি টিউবের নিচে আরেকটি টিউব করা হবে। এজন্য সেখানে মেট্রোরেলের গভীরতা হবে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০ মিটার নিচে।’

এছাড়া মাটির গভীরে হলেও টানেলে অক্সিজেনের কোনও ঘাটতি হবে না এবং টানেলের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে পানি যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেন পানি নিষ্কাশন করা যায় সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

“টানেল বোরিং মেশিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একদিকে মাটি খুঁড়ে টানেল তৈরি করবে এবং একই সঙ্গে টানেলের জন্য প্রিকাস্ট সেগমেন্টে (কংক্রিটের কাঠামো) বসিয়ে দেবে। কাজ করার সময় সড়কে যানবাহন চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না।“

আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নির্মাণকালে বের করে আনা মাটিগুলো কোথায় ফেলা হবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে নানা প্রশ্ন থাকলেও মি. সিদ্দিকী বলছেন বিভিন্ন রাস্তার কাজে এই মাটি ব্যবহার করা হবে।

“ঢাকা সিলেট হাইওয়ে , আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে যে হচ্ছে সেসব রাস্তায় আমাদের এখান থেকে বের করা মাটি ব্যবহার হবে – সে কো-অর্ডিনেশন আমরা করে নিয়েছি”।

বাস্তবসম্মত নয়?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবেচনায় এই প্রকল্পের উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে ঢাকা শহরের জন্য এটা বাস্তবসম্মত নয়।

তারা বলছেন, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে সীমিত সংখ্যক পাতাল রেল বা সাবওয়ে থাকলে এমন প্রকল্প অতি ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা এমন নির্মাণ কাজের দিকে এখন ঝুঁকছে না।

দেশের মানুষ, অর্থনীতির প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে এমন ব্যয়বহুল প্রকল্প শহরের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

অধ্যাপক শামসুল হক বলছেন, এ প্রকল্পে যে খরচ হবে সেটা সরকারকে তুলতে হবে। আর সেটা তুলতে গিয়ে ভাড়া অনেক বেড়ে গেলে সেটি সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কাজে লাগবে সে প্রশ্ন তুলছেন অধ্যাপক হক।

“হয়তো দেরি হয়ে গেছে তারপরও আমি আহ্বান জানাবো এই বিষয়টা যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়।”

CategoriesUncategorized

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *